বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের খুটিনাটি

Posted by

বায়োফ্লক হল উপকারি ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব ও শৈবালের সমম্বয়ে তৈরি হওয়া পাতলা আস্তরণ। যা জলকে ফিল্টার করে। জল থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় ক্ষতিকর উপাদানগুলি শোষণ করে নেয় এবং এর প্রোটিন সমৃদ্ধ উপাদান খাবার হিসেবে মাছ গ্রহণ করতে পারে।

এই প্রযুক্তিতে যেহেতু উপকারী ব্যাকটেরিয়া (প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া) ব্যবহার করা হয় যা পানির গুণাগুণ বৃদ্ধি ও রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে পুরো সিস্টেমকে উচ্চ বায়োসিকিউরিটি প্রদান করে। – এই কথা গুলো উইকিপিডিয়ার

আপনিও স্বাবলম্বী হতে পারেন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে। তবে বায়োফ্লকে মাছ চাষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা ও ফ্লক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, মাছের মলও উচ্ছিষ্ট খাদ্যকে মাছের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনে রূপান্তরের মাধ্যমে মাছের বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করে।

বায়োফ্লক প্রজেক্ট করার আগে পানির উৎস কী হবে এবং তার গুণাগুণ বা ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে।

গভীর নলকূপ, সমুদ্র, নদী, বড় জলাশয়, লেক, বৃষ্টি ইত্যাদির পানির গুণ ও মান ভালো থাকলে বায়োফ্লক প্রজেক্টের পানির উৎস হতে পারে।

বায়োফ্লকের জন্য উপযোগী পানি তৈরীঃ প্রথমে ট্যাংক ব্লিচিং পাউডার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।

এর পর নির্বাচিত পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে পানি প্রবেশ করাতে হবে।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে পানির গুণাবলীঃ

১. তাপমাত্রা – ২৫ – ৩০ °C
২. পানির রং – সবুজ, হালকা সবুজ, বাদামী।
৩. দ্রবীভূত অক্সিজেন – ৭- ৮ mg/L
৪. পিএইচ – ৭.৫ – ৮.৫
৫. ক্ষারত্ব – ৫০ – ১২০ mg/L
৬. খরতা – ৬০ – ১৫০ mg/ L
৭. ক্যালসিয়াম – ৪ – ১৬০ mg/L
৮. অ্যামোনিয়া – ০.০১ mg/L
৯. নাইট্রাইট – ০.১ – ০.২ mg/L
১০. নাইট্রেট – ০ – ৩ mg/L
১১. ফসফরাস – ০.১ – ৩ mg/L
১২. H2S – ০.০১ mg/ L
১৩. আয়রন – ০.১ – ০.২ mg/L
১৪. পানির স্বচ্ছতা – ২৫ – ৩৫ সে.মি.
১৫. পানির গভীরতা – ৩ – ৪ ফুট
১৬. ফলকের ঘনত্ব – ৩০০ গ্রাম / টন
১৭.TDS – ১৪০০০ – ১৮০০০ mg/L
১৮. লবণাক্ততা – ৩ – ৫ ppt

পানিতে ফ্লক তৈরিঃ– প্রথম ডোজে ৫ ppm প্রেবায়োটিক, ৫০ ppm চিটাগুড়, ৫ ppm ইস্ট, পানি প্রতি টনের জন্য ১ লিটার, একটি প্লাস্টিকের বালতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে ৮- ১০ ঘণ্টা কালচার করে প্রয়োগ করতে হবে।

২য় দিন থেকে ১ppm প্রোবায়োটিক, ৫ ppm চিটাগুড়, ১ ppm ইস্ট, প্রতি টনের জন্য ১ লিটার পানি দিয়ে উপরের সময় ও নিয়মে কালচার করে প্রতি দিন প্রয়োগ করতে হবে। সুত্র উইকিপিডিয়ার

কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ: পানিতে যথাযথ পরিমাণ ফ্লক তৈরি হলে-

১. পানির রং সবুজ বা বাদামি দেখায়
২. পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখা যায়
৩. পরীক্ষা করলে পানি অ্যামোনিয়া মুক্ত দেখায়
৪. প্রতি লিটার পানিতে ০.৩ গ্রাম ফ্লকের ঘনত্ব পাওয়া যাবে
৫. ক্ষুদিপানা দেওয়ার পর তাদের বংশ বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।

ট্যাংক নির্মাণ: প্রথমে গ্রেড রড দিয়ে ট্যাংকের বৃত্তাকার খাঁচাটি তৈরি করতে হবে। যে স্থানে ট্যাংকটি স্থাপন করা হবে; সেখানে খাঁচার পরিধির সমান করে সিসি ঢালাই দিতে হবে।

বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে পানির একটি আউটলেট পাইপ স্থাপন করতে হবে। এরপর খাঁচাটিকে ঢালাই মেঝের উপর স্থাপন করে মাটিতে গেঁথে দিতে হবে।

মেঝের মাটি শক্ত ও সমান হলে ঢালাইয়ের পরিবর্তে পরিধির সমান করে পুরু পলিথিন বিছিয়েও মেঝে প্রস্তুত করা যায়।

এরপর উন্নতমানের তারপুলিন দিয়ে সম্পূর্ণ খাঁচাটি ঢেকে দিতে হবে। তার ওপর পুরু পলিথিন দিয়ে আচ্ছাদিত করে তাতে পানি মজুদ করতে হবে।

এরেটর পাম্প: বায়োফ্লক ট্যাংকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপ্লাই দেওয়ার জন্য একটি এরেটর পাম্প স্থাপন করতে হবে। ৬ ফুট ব্যাসার্ধের এবং ৪ ফুট উচ্চতার একটি ট্যাংকে প্রায় ৩০ হাজার শিং মাছ চাষ করা যাবে।

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। আমাদের দেশে সচরাচর চাষকৃত মাছ যেমন- তেলাপিয়া, রুই, শিং, মাগুর, পাবদা, গুলশা ও চিংড়ীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা যেতে পারে। তবে, যারা নতুন করে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ শুরু করতে চান তারা অবশ্যই প্রথমে তেলাপিয়া, শিং ও মাগুর মাছ দিয়ে চাষ শুরু সমীচীন হবে।

এবার আসুন জেনে নেই বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের লাভ ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র-

বায়োফ্লক মাছ চাষের লাভ ক্ষতিঃ

যারা লাভ ক্ষতির হিসাব চেয়ে চেয়ে হয়রান তাদের জন্য ১০ টা ১০ হাজার ট্যাংকে। প্রাথমিক ধারণা দিতে চেষ্টা করছি মাত্র। এই হিসাব চূড়ান্ত নয়। বাস্তব চিত্র ভিন্নও হতে পারে।

নির্ধারিত খরচঃ

  • ট্যাংক নির্মাণ খরচ ৪ লাখ
  • শেড নির্মাণ খরচ ৩ লাখ
  • অন্যান্য খরচ (যেমন যন্ত্রপাতি, সিসি ক্যামেরা, ইলেক্টিসিটি , গভির নলকূপ ইত্যাদি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা সহ মোট ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা

১ বছরের উৎপাদন খরচঃ

  • মাছের পোনাঃ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা
  • প্রোবায়োটিকঃ ২৫ হাজার টাকা
  • খাবারঃ ৪ লাখ ৫০ হাজার
  • ২ জনের কর্মচারীর বেতনঃ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা
  • বিদ্যুৎ বিল এবং পানির বিল ও অন্যান্যঃ ৮০ হাজার টাকা
  • মোট উৎপাদন খরচঃ ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা

(নোটঃ শিং মাছ হিসেব করে করা অন্য মাছ হলে হিসাব আলাদা হবে)

সম্ভাব্য মাছ বিক্রিঃ

প্রতি ট্যাংকে ৩৫০ কেজি ৩০০ টাকা কেজি হিসেবে= ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা (বাজার দর কম বেশি হতে পারে)
তাহলে দেখ যাচ্ছে প্রাথমিক ১৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে বছরে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব।

১ বছরে মুনাফাঃ

  • মাছ বিক্রি – (উৎপাদন খরচ + ডেপ্রিসিয়েশন)
  • ১৮,৯০,০০০ টাকা – ( ১০,১৫০০০ টাকা + ২,০০,০০০ টাকা)
  • ৬,৭৫০,০০ টাকা

‘বায়োফ্লক’পদ্ধতিকে দেশীয় আবহাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে গবেষণা করে যাচ্ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের একদল গবেষক।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্থাপন করা হয়েছে বায়োফ্লক ল্যাব।

গবেষক দলের প্রধান ড. এ এম সাহাবউদ্দিন বলেন, বায়োফ্লক প্রযুক্তি মাছ চাষের একটি পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি যা ক্রমাগতভাবে পানিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলোকে পুনরাবর্তনের মাধ্যমে পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করে।

বায়োফ্লক হলো প্রোটিন সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ এবং বিভিন্ন অনুজীবের সমষ্টি।

সাধারণত মাছের জন্য পুকুরে যে খাবার দেয়া হয় তার উচ্ছিষ্ট পুকুরে দূষিত অ্যামোনিয়া তৈরি করে যা মাছের জন্য ক্ষতিকর।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া অ্যামোনিয়া থেকে একক প্রোটিন তৈরি করে যা মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

এতে একদিকে পুকুরে মাছ চাষের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়, তেমনি মাছের খাবার খরচ কমে যায়। ফলে মাছের মজুদ ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়া যায়।

সনাতন পদ্ধতিতে যেখানে ১০ টি মাছ চাষ করা যায় , এ পদ্ধতিতে সেখানে ৩০ টি পর্যন্ত মাছ চাষ করা যায়।

এই প্রযুক্তি পানিতে বিদ্যমান কার্বন ও নাইট্রোজেনের সাম্যবস্থা নিশ্চিত করে পানির গুনাগুণ বৃদ্ধি ও ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করে।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকরা জানান, এই পদ্ধতিতে বাড়ির আঙিনায় , ছাদে, অল্প জায়গায় এমনকি সবজি ও মাছ একসাথে চাষ করা যায়।

এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য ট্যাংক, অক্রিজেন সরবারহের পাম্প ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

প্রথমে ট্যাংকে পানি দিয়ে এক সপ্তাহ অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে।

এতে আয়রন বা অন্য ভারী পদার্থ থাকলে উপরে জমা হবে।

এরপর প্রতি ১ হাজার লিটারে ১ কেজি হারে আয়োডিন মুক্ত সাধারণ লবণ প্রয়োগ করতে হবে। এরপর টিডিএস ১২০০ এর উপরে হলে প্রতি ১ হাজার লিটারে ১০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে।

পিএইচ ৭.৫ এর কাছাকাছি হলে ভালো ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট অনুপাতে পানিতে দিতে হবে।

সাথে কার্বন সোর্স হিসেবে মোলাসেস ৫০-১০০ গ্রাম দিতে হবে।

সবসময় অক্রিজেনের সরবরাহ রাখতে হবে। দুই সপ্তাহ পর এতে ব্যাকটেরিয়া , প্রোটোজোয়া, শৈবাল তৈরি হবে যা উপকারী।

পানিতে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বায়োফ্লক তৈরি হলে মাছ ছাড়া যাবে।

এ পদ্ধতিতে পানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। তবে অতিরিক্ত ফ্লক তৈরি হলে বা অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে ৫-১০ শতাংশ পানি প্রতি সপ্তাহে বের করে দিতে হবে।

প্রতিদিন পিএইচ, অ্যমোনিয়া এবং ফ্লক ঘনত্ব পরিমাপ করতে হবে।

মাছের খাবার হিসেবে ভাসমান খাবার দেওয়া ভালো।

কোনো ধরনের মাচ চাষ করা যাবে জানতে চাইলে ড. এ এম সাহাবউদ্দিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়।

আমাদের দেশে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছ চাষ এখনও ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি।

আমাদের দেশে সচরাচর চাষকৃত মাছ যেমন- তেলাপিয়া, রুই, শিং, মাগুর, পাবদা, গুলশা ও চিংড়ীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা যেতে পারে।

তবে যারা নতুন করে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ শুরু করতে চান তাদের ক্ষেত্রে প্রথমে তেলাপিয়া, শিং ও মাগুর মাছ দিয়ে চাষ শুরু করা সমীচীন হবে।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ কেন লাভজনক-প্রশ্নোত্তরে ড. সাহাবউদ্দিন বলেন, মাছ চাষের শতকরা ৬০ ভাগ খরচ হয় খাবারের জন্য।

এ পদ্ধতিতে খাবার কম লাগে, রোগের প্রাদুর্ভাব কম হয়। অল্প জায়গায় বেশি পরিমাণ মাছ চাষ করে অধিক মুনাফা অর্জন করা যায়।

এ পদ্ধতিতে বাড়িতে যে কোন চাষী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতা অর্জন পূর্বক ৩০-৪০ টি ট্যাংকে সহজেই মাছ চাষ করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, এ প্রযুক্তি যদি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে দেশে মাছের উৎপাদন অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব।

যা সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করবে।

Mosrur Zunaid, the Editor of Ctgtimes.com and Owner at BDFreePress.com, is working against the media’s direct involvement in politics and is outspoken about @ctgtimes's editorial ethics. Mr. Zunaid also plays the role of the CEO of HostBuzz.Biz (HostBuzz Technology Limited).

One comment

  1. এই ধরনের মাছ চাষের জন্য কোথায় প্রশিক্ষন নেয়া যাবে?

মতামত দিন